🌐 এই লেখা অন্য ভাষায়: English · हिन्दी
পঞ্জিকার পাতায় তিথি, বার, নক্ষত্রের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ থাকে—করণ। অনেকেই হয়তো চোখের সামনে দিয়ে যাওয়া এই শব্দটিকে বিশেষ আমলে নেন না। কিন্তু জ্যোতিষ দর্শনে করণের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ করণ হলো সময়ের সবচেয়ে সূক্ষ্মতম পরিমাপ—একটি তিথির অর্ধাংশ। বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা প্রতিটি করণের জন্য আলাদা কাজ বলেছে। যেমন—‘বব’ করণে শুভ ও স্থায়ী কাজ, ‘বণিজ’ করণে ব্যবসা, আর ‘বিষ্টি’ বা ভদ্রায় কোনো শুভকর্ম নয়।
আজ আমরা জানব করণ আসলে কী, কীভাবে এটি গণনা করা হয়, ১১টি করণের শাস্ত্রীয় শ্রেণিবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য, এবং জ্যোতিষশাস্ত্রে করণের গুরুত্ব—সবকিছু সহজ বাংলায়, জ্যোতিষ দর্শনের ভাষায়।
করণ কী? জ্যোতিষ দর্শনের সংজ্ঞা
করণ হলো তিথির অর্ধাংশ। একটি তিথির সময়কালকে দুই ভাগে ভাগ করলে প্রতিটি ভাগকে করণ বলে। অর্থাৎ, ৩০টি তিথিতে মোট ৬০টি করণ হয়। কিন্তু এই ৬০টি করণ মাত্র ১১টি নামে পরিচিত। কারণ কিছু করণ পুনরাবৃত্তি হয়, আর কিছু করণ নির্দিষ্ট তিথিতেই আসে।তিথির অর্ধাংশকে করণ বলে, এবং এটি কর্মের সূক্ষ্ম নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
১১টি করণের শাস্ত্রীয় শ্রেণিবিভাগ
মোট ১১টি করণ। এগুলিকে শাস্ত্রে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—চলক করণ (চলমান) এবং স্থির করণ (অচল)। এই শ্রেণিবিভাগ করণগুলির পুনরাবৃত্তির প্রকৃতি নির্দেশ করে।
চলক করণ (৭টি)
এই করণগুলি নিয়মিতভাবে করণচক্রে আবর্তিত হয়। প্রতিটি করণ একবার করে আসে, তারপর চক্র আবার শুরু হয়। চলক করণগুলি হলো—
প্রতিটি করণের অধিপতি দেবতা ও উপযোগী কাজ এখানে বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা-র ৯৯তম অধ্যায় (তিথি ও করণ) থেকে নেওয়া—
| ক্রম | করণের নাম | অধিপতি দেবতা | উপযোগী কাজ (বৃহৎসংহিতা ৯৯) |
|---|---|---|---|
| ১ | বব | ইন্দ্র | শুভ কাজ — চর ও স্থির দুই রকমই — এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টির কাজ |
| ২ | বালব | ব্রহ্মা | দান ও ব্রাহ্মণের হিতকর কাজ |
| ৩ | কৌলব (কুলব) | মিত্র | আনন্দের কাজ ও বন্ধুত্ব স্থাপন |
| ৪ | তৈতিল (তৈতুল) | অর্যমা | জনসাধারণের প্রিয় কাজ, গৃহনির্মাণ |
| ৫ | গর (গরজ) | ভূ (পৃথিবী) | চাষ, বীজ বোনা, গৃহনির্মাণ |
| ৬ | বণিজ | শ্রী | স্থায়ী কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য |
| ৭ | বিষ্টি (ভদ্রা) | যম | শুভকাজ নিষিদ্ধ — কেবল শত্রুদমন ও বিষ-সংক্রান্ত কাজের কথা বলা আছে |
চলক করণের চক্র: বব → বালব → কৌলব → তৈতিল → গর → বণিজ → বিষ্টি → আবার বব—এই ক্রমে চলক করণগুলি আবর্তিত হয়।
স্থির করণ (৪টি)
এই করণগুলি নির্দিষ্ট তিথিতে আসে। এগুলি করণচক্রের অংশ নয়, বরং বিশেষ তিথিতে স্থিরভাবে অবস্থান করে।
| করণের নাম | কোন অর্ধতিথিতে | অধিপতি দেবতা | উপযোগী কাজ (বৃহৎসংহিতা ৯৯) |
|---|---|---|---|
| শকুনি | কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর দ্বিতীয়ার্ধ | কলি | স্বাস্থ্য ও পুষ্টির কাজ, ওষুধ সেবন, মন্ত্র শেখা ও জপ |
| চতুষ্পাদ (চতুষ্পদ) | অমাবস্যার প্রথমার্ধ | বৃষ | গরু, ব্রাহ্মণ, পিতৃপুরুষ ও রাজার সঙ্গে যুক্ত কাজ |
| নাগ | অমাবস্যার দ্বিতীয়ার্ধ | সর্প | স্থির ও কঠোর প্রকৃতির কাজ — শুভকর্মের জন্য নয় |
| কিংস্তুঘ্ন (কিম্বস্তুঘ্ন) | শুক্লপক্ষের প্রতিপদের প্রথমার্ধ | বায়ু | স্বাস্থ্য ও পুষ্টির কাজ এবং শুভকাজ |
করণ গণনার শাস্ত্রীয় পদ্ধতি
মৌলিক সূত্র
সূর্য সিদ্ধান্ত (স্পষ্টাধিকার) ও বৃহৎসংহিতা (অধ্যায় ৯৯) করণের ক্রম দিয়েছে — কৃষ্ণ চতুর্দশীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে চারটি স্থির করণ, তারপর সাতটি চর করণ মাসে আটবার। আধুনিক ভাষায় সূত্রটি—অর্ধতিথি-সংখ্যা = ⌊(চন্দ্রের দ্রাঘিমা − সূর্যের দ্রাঘিমা) ÷ ৬°⌋ (০ থেকে ৫৯)
এখানে ⌊ ⌋ চিহ্নটি ফ্লোর ফাংশন — ভাগফলের কেবল পূর্ণসংখ্যা অংশ। চন্দ্র সূর্যের থেকে প্রতি ৬° এগোলে একটি করণ শেষ হয়, তাই এক চান্দ্র মাসে ৬০টি করণ। গোনা শুরু অমাবস্যার শেষে, যখন চন্দ্র-সূর্যের দূরত্ব ০° — অর্থাৎ শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে।
ধাপে ধাপে গণনা
ধাপ ১: চন্দ্র ও সূর্যের নিরয়ন দ্রাঘিমা নিন। চন্দ্র − সূর্য করুন; ফল ঋণাত্মক হলে ৩৬০° যোগ করুন।
ধাপ ২: এই দূরত্বকে ৬° দিয়ে ভাগ করে পূর্ণসংখ্যা অংশ নিন — এটাই অর্ধতিথি-সংখ্যা (০ থেকে ৫৯)।
ধাপ ৩: সংখ্যা ০ হলে কিংস্তুঘ্ন, ৫৭ হলে শকুনি, ৫৮ হলে চতুষ্পাদ, ৫৯ হলে নাগ — এই চারটি স্থির করণ।
ধাপ ৪: সংখ্যা ১ থেকে ৫৬ হলে চর করণ: সংখ্যা থেকে ১ বিয়োগ করে ৭ দিয়ে ভাগ করুন। ভাগশেষ ০ = বব, ১ = বালব, ২ = কৌলব, ৩ = তৈতিল, ৪ = গর, ৫ = বণিজ, ৬ = বিষ্টি।
করণের ক্রমিক তালিকা (শাস্ত্রীয় গণনার জন্য)
| ক্রমিক নম্বর | করণের নাম | প্রকৃতি | মাসে কোথায় আসে |
|---|---|---|---|
| ১ | বব | চর | শুক্লপক্ষের প্রতিপদের দ্বিতীয়ার্ধে প্রথমবার, তারপর প্রতি সাত অর্ধতিথি অন্তর |
| ২ | বালব | চর | ববের পরের অর্ধতিথি |
| ৩ | কৌলব | চর | বালবের পরের অর্ধতিথি |
| ৪ | তৈতিল | চর | কৌলবের পরের অর্ধতিথি |
| ৫ | গর | চর | তৈতিলের পরের অর্ধতিথি |
| ৬ | বণিজ | চর | গরের পরের অর্ধতিথি |
| ৭ | বিষ্টি (ভদ্রা) | চর | বণিজের পরের অর্ধতিথি — সাতটি চর করণ মাসে আটবার করে ঘোরে (৫৬টি অর্ধতিথি) |
| ৮ | শকুনি | স্থির | কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর দ্বিতীয়ার্ধ |
| ৯ | চতুষ্পাদ | স্থির | অমাবস্যার প্রথমার্ধ |
| ১০ | নাগ | স্থির | অমাবস্যার দ্বিতীয়ার্ধ |
| ১১ | কিংস্তুঘ্ন | স্থির | শুক্লপক্ষের প্রতিপদের প্রথমার্ধ |
উদাহরণ ১: শুক্লপক্ষের প্রতিপদ, দূরত্ব ৩°
- ৩ ÷ ৬ = ০.৫ → পূর্ণসংখ্যা অংশ ০
- অর্ধতিথি-সংখ্যা ০ = কিংস্তুঘ্ন করণ (স্থির)
উদাহরণ ২: শুক্লপক্ষের প্রতিপদ, দূরত্ব ৯°
- ৯ ÷ ৬ = ১.৫ → পূর্ণসংখ্যা অংশ ১
- ১ − ১ = ০; ০ ÷ ৭-এর ভাগশেষ ০ = বব করণ
উদাহরণ ৩: কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়া, দূরত্ব ১৯৮°
- ১৯৮ ÷ ৬ = ৩৩ → অর্ধতিথি-সংখ্যা ৩৩
- ৩৩ − ১ = ৩২; ৩২ ÷ ৭-এর ভাগশেষ ৪ = গর করণ — কৃষ্ণা দ্বিতীয়ার দ্বিতীয়ার্ধ (নিচের সারণীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন)
তিথি অনুযায়ী করণের সারণি
নিচে তিথি অনুযায়ী করণের সম্পূর্ণ তালিকা দেওয়া হলো—
শুক্লপক্ষের করণ
| তিথি | প্রথমার্ধের করণ | দ্বিতীয়ার্ধের করণ |
|---|---|---|
| প্রতিপদ (১) | কিংস্তুঘ্ন (স্থির) | বব |
| দ্বিতীয়া (২) | বালব | কৌলব |
| তৃতীয়া (৩) | তৈতিল | গর |
| চতুর্থী (৪) | বণিজ | বিষ্টি |
| পঞ্চমী (৫) | বব | বালব |
| ষষ্ঠী (৬) | কৌলব | তৈতিল |
| সপ্তমী (৭) | গর | বণিজ |
| অষ্টমী (৮) | বিষ্টি | বব |
| নবমী (৯) | বালব | কৌলব |
| দশমী (১০) | তৈতিল | গর |
| একাদশী (১১) | বণিজ | বিষ্টি |
| দ্বাদশী (১২) | বব | বালব |
| ত্রয়োদশী (১৩) | কৌলব | তৈতিল |
| চতুর্দশী (১৪) | গর | বণিজ |
| পূর্ণিমা (১৫) | বিষ্টি | বব |
কৃষ্ণপক্ষের করণ
| তিথি | প্রথমার্ধের করণ | দ্বিতীয়ার্ধের করণ |
|---|---|---|
| প্রতিপদ (১৬) | বালব | কৌলব |
| দ্বিতীয়া (১৭) | তৈতিল | গর |
| তৃতীয়া (১৮) | বণিজ | বিষ্টি |
| চতুর্থী (১৯) | বব | বালব |
| পঞ্চমী (২০) | কৌলব | তৈতিল |
| ষষ্ঠী (২১) | গর | বণিজ |
| সপ্তমী (২২) | বিষ্টি | বব |
| অষ্টমী (২৩) | বালব | কৌলব |
| নবমী (২৪) | তৈতিল | গর |
| দশমী (২৫) | বণিজ | বিষ্টি |
| একাদশী (২৬) | বব | বালব |
| দ্বাদশী (২৭) | কৌলব | তৈতিল |
| ত্রয়োদশী (২৮) | গর | বণিজ |
| চতুর্দশী (২৯) | বিষ্টি | শকুনি (স্থির) |
| অমাবস্যা (৩০) | চতুষ্পাদ (স্থির) | নাগ (স্থির) |
করণের ব্যবহারিক প্রয়োগ
১. শুভকর্মে করণের ভূমিকা
মুহূর্ত বিচারে করণ দেখা হয় তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও লগ্নের সঙ্গে মিলিয়ে — একা করণ দিয়ে শুভ সময় ঠিক হয় না। বৃহৎসংহিতা (৯৯/৩) বলে, যে কাজ কোনো দেবতার নক্ষত্রে করার বিধান, সেই দেবতার তিথি ও করণেও তা করা যায়।
সাধারণ শুভকর্মে প্রধান নিয়ম একটাই — বিষ্টি (ভদ্রা) বর্জন। আমাদের পঞ্জিকা বিষ্টির সঙ্গে শকুনি, চতুষ্পাদ ও নাগকেও সাধারণ শুভকর্মের সময় থেকে বাদ রাখে; এই তিন স্থির করণের জন্য বৃহৎসংহিতা কেবল নির্দিষ্ট কিছু কাজের কথা বলেছে (উপরের সারণী)।
২. বিষ্টি করণ (ভদ্রা)
বিষ্টি করণই ভদ্রা। মুহূর্ত চিন্তামণি (শুভাশুভ প্রকরণ) ভদ্রাকে সমস্ত শুভকর্মে বর্জনীয় বলে, আর কোন তিথির কোন অর্ধে ভদ্রা পড়ে তাও বলে দেয় — যা ওপরের গণনার সঙ্গে হুবহু মেলে:- শুক্লপক্ষ: চতুর্থী ও একাদশীর দ্বিতীয়ার্ধ; অষ্টমী ও পূর্ণিমার প্রথমার্ধ
- কৃষ্ণপক্ষ: তৃতীয়া ও দশমীর দ্বিতীয়ার্ধ; সপ্তমী ও চতুর্দশীর প্রথমার্ধ
অর্থাৎ চান্দ্র মাসে আটবার, প্রতিবার প্রায় আধ দিন।
📖 গুরুত্বপূর্ণ অংশ: মুহূর্ত চিন্তামণির টীকাকারদের মতে ভদ্রার শেষ তিন ঘটি (প্রায় ৭২ মিনিট — ‘ভদ্রার পুচ্ছ’) দোষমুক্ত। নিয়মটা কাজ শুরু করার সময়ের জন্য — আগে থেকে চলা কাজে খাটে না।
৩. স্থির করণ
চারটি স্থির করণ মাসে একবারই আসে, অমাবস্যার দুই দিকে। বৃহৎসংহিতা এদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা কাজ বলেছে (উপরের সারণী) — কিংস্তুঘ্নে শুভকাজ চলে, নাগে নয়।
করণের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি
পঞ্চাঙ্গের পাঁচ অঙ্গকে পঞ্চভূতের সঙ্গে মেলানো আধুনিক লেখকদের ব্যাখ্যা — লেখকভেদে করণকে কেউ আকাশ, কেউ পৃথ্বীতত্ত্বের সঙ্গে মেলান। তবে করণের প্রভাব যে সূক্ষ্ম, তাতে দ্বিমত নেই। এটি সময়ের সেই অংশকে নির্দেশ করে যা সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না, কিন্তু কর্মের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
করণ সূক্ষ্ম সময়ের পরিমাপক, যা কর্মের সিদ্ধি প্রদানের প্রবণতা তৈরি করে।
করণ গণনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য
করণ গণনার জন্য নিম্নলিখিত তথ্য প্রয়োজন—
১. তিথি তথ্য প্রথমে তিথি সংখ্যা এবং তিথির অগ্রগতি ডিগ্রি জানতে হবে।
২. চন্দ্র ও সূর্যের দ্রাঘিমাংশ তিথি গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যের দ্রাঘিমাংশ প্রয়োজন। এই তথ্য পাওয়া যায়—
- সূর্য সিদ্ধান্ত-এর মতো গণিত-গ্রন্থ
- আধুনিক জ্যোতিষ সফটওয়্যার
- নির্ভরযোগ্য পঞ্জিকা
৩. সূর্যোদয়ের সময় পঞ্জিকা দিনের করণ লেখে সূর্যোদয়ের মুহূর্ত ধরে, আর দিনের মধ্যে করণ বদলালে বদলের সময়টাও দেয়। তাই স্থানীয় সূর্যোদয়ের সময় জানা জরুরি।
উপসংহার: করণ—সময়ের সূক্ষ্মতম পরিমাপ
করণ গণনার পদ্ধতি শুধু একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা নয়। এটি প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতিষ দর্শনের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত—যেখানে সময়কে এতটাই সূক্ষ্মভাবে ভাগ করা হয়েছে যে, কর্মের ফলপ্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ববে শুভ ও স্থায়ী কাজ, বণিজে ব্যবসা, বিষ্টিতে শুভকর্ম বর্জন — বৃহৎসংহিতা ও মুহূর্ত চিন্তামণির এই নিয়ম আজও পঞ্জিকার মুহূর্ত-বিচারে ব্যবহৃত হয়।
“করণ জানলে জানবে সময়ের সূক্ষ্ম দান,
বব-বালবে শক্তির আভাস, নাগ-বিষ্টি করিহ সাবধান।।”
❓ প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: বিষ্টি করণ বা ভদ্রা কেন এড়িয়ে চলা উচিত? এটি কি সবসময় অশুভ?
উত্তর: মুহূর্ত চিন্তামণি ভদ্রাকে (বিষ্টি করণ) সমস্ত শুভকর্মে বর্জনীয় বলে, আর বৃহৎসংহিতাও বলে বিষ্টিতে শুভকাজ নয়। তবে টীকাকারদের মতে ভদ্রার শেষ তিন ঘটি (‘পুচ্ছ’, প্রায় ৭২ মিনিট) দোষমুক্ত। নিয়মটা নতুন কাজ শুরু করার জন্য — আগে থেকে চলা কাজে খাটে না।
প্রশ্ন ২: বব করণে কোন কাজ করা যায়?
উত্তর: বৃহৎসংহিতা (অধ্যায় ৯৯) অনুযায়ী বব করণে শুভ কাজ — চর ও স্থির দুই রকমই — আর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির কাজ করা যায়। শত্রুদমনের মতো কাজের কথা বলা আছে বিষ্টি করণে, ববে নয়। তবে শুভ সময় ঠিক হয় তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও লগ্ন মিলিয়ে, একা করণ দিয়ে নয়।
প্রশ্ন ৩: নাগ করণে বিবাহ করা যায়?
উত্তর: বৃহৎসংহিতা নাগ করণকে স্থির ও কঠোর প্রকৃতির কাজের করণ বলেছে — বিবাহের মতো মঙ্গলকর্মের নয়। আমাদের পঞ্জিকাতেও নাগ শুভকর্মে বর্জনীয় করণের তালিকায়। তাছাড়া নাগ আসে অমাবস্যার দ্বিতীয়ার্ধে, আর মুহূর্ত চিন্তামণি অমাবস্যাকেই মঙ্গলকর্মে বর্জন করে।
প্রশ্ন ৪: আমি কীভাবে নিজে করণ গণনা করতে পারি?
উত্তর: নিজে করণ গণনা করতে চাইলে প্রথমে তিথি ও তিথির অগ্রগতি ডিগ্রি জানতে হবে। এর জন্য চন্দ্র ও সূর্যের দ্রাঘিমাংশ প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য পঞ্জিকা ব্যবহার করাই সবচেয়ে সহজ ও উত্তম পদ্ধতি। পঞ্জিকায় প্রতিদিনের করণ বিস্তারিত উল্লেখ থাকে।
প্রশ্ন ৫: ১১টি করণের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে শুভ?
উত্তর: কাজভেদে আলাদা। বৃহৎসংহিতায় ববের কাজের তালিকা সবচেয়ে বিস্তৃত — শুভ, চর ও স্থির সব কাজ। ব্যবসায় বণিজ, চাষ ও গৃহনির্মাণে গর, বন্ধুত্ব ও আনন্দের কাজে কৌলব, দানে বালব। সব শুভকর্মে বর্জনীয় কেবল বিষ্টি (ভদ্রা)।
প্রশ্ন ৬: অমাবস্যার আশপাশের করণ কেন আলাদা?
উত্তর: চারটি স্থির করণই অমাবস্যার আশপাশে আসে — কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর দ্বিতীয়ার্ধে শকুনি, অমাবস্যার দুই অর্ধে চতুষ্পাদ ও নাগ, আর শুক্লপক্ষের প্রতিপদের প্রথমার্ধে কিংস্তুঘ্ন। এই চার অর্ধতিথিতে চন্দ্র সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকে। বাকি ৫৬টি অর্ধতিথি সাতটি চর করণ পালা করে ভাগ করে নেয়। পূর্ণিমায় কোনো স্থির করণ নেই — পূর্ণিমার দুই অর্ধ বিষ্টি ও বব।
প্রশ্ন ৭: করণ গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যের দ্রাঘিমাংশ কোথায় পাব?
উত্তর: করণ গণনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার কয়েকটি নির্ভরযোগ্য উৎস হলো—(ক) সূর্য সিদ্ধান্তের মতো প্রাচীন গণিত-গ্রন্থ, (খ) আধুনিক জ্যোতিষ সফটওয়্যার, (গ) নির্ভরযোগ্য পঞ্জিকা। সাধারণ মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য পঞ্জিকা ব্যবহার করাই সবচেয়ে সহজ ও উত্তম পদ্ধতি।
প্রশ্ন ৮: কৌলব করণ কি?
উত্তর: কৌলব (কুলব) এগারোটি করণের তৃতীয়টি — চর করণ। বৃহৎসংহিতা (৯৯/৪) অনুযায়ী এর অধিপতি মিত্র, আর ৯৯/৬ বলে কৌলবে আনন্দের কাজ ও বন্ধুত্ব স্থাপন শুভ। মাসে আটবার আসে — প্রথমবার শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়ার দ্বিতীয়ার্ধে।
প্রশ্ন ৯: বিষ্টি করণ কি?
উত্তর: বিষ্টিই ভদ্রা — সপ্তম চর করণ, অধিপতি যম (বৃহৎসংহিতা ৯৯/৪)। বৃহৎসংহিতা (৯৯/৭) বিষ্টিতে শুভকাজ নিষেধ করে, আর মুহূর্ত চিন্তামণি (শুভাশুভ প্রকরণ, শ্লোক ৪৩) একে সমস্ত শুভকর্মে বর্জনীয় বলে। মাসে আটবার আসে: শুক্লপক্ষে চতুর্থী ও একাদশীর দ্বিতীয়ার্ধে, অষ্টমী ও পূর্ণিমার প্রথমার্ধে; কৃষ্ণপক্ষে তৃতীয়া ও দশমীর দ্বিতীয়ার্ধে, সপ্তমী ও চতুর্দশীর প্রথমার্ধে।
📖 পরবর্তী পোস্টের ঘোষণা
আজ আমরা জানলাম করণ গণনার পদ্ধতি—শাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে। পঞ্চাঙ্গের পাঁচটি অঙ্গ—বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণ—সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা শেষ হলো। আশা করি, এই ধারাবাহিক পোস্টগুলি পড়ে আপনি পঞ্চাঙ্গের গভীরতা ও জ্যোতিষ দর্শনের মহিমা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেয়েছেন।
হস্তরেখা বিচার₹১,০০১ থেকে
জন্মকুণ্ডলী₹১,৫০১ থেকে
বিবাহ মিলন₹২,০০১ থেকে
রত্নপাথরপরামর্শ
বাস্তু শাস্ত্রপরামর্শ
সংখ্যাতত্ত্বপরামর্শ
প্রশ্ন জ্যোতিষপরামর্শ
রাশিফলপ্রতিদিন বিনামূল্যে
পঞ্জিকাবাংলা তারিখ