"আয়ুঃ প্রজাং ধনং বিদ্যাং স্বর্গং মোক্ষং সুখানি চ। প্রযচ্ছন্তি তথা রাজ্যং পিতরঃ শ্রাদ্ধতর্পিতাঃ॥" — তৃপ্ত পিতৃপুরুষ আয়ু, সন্তান, ধন, বিদ্যা, স্বর্গ, মোক্ষ ও সুখ প্রদান করেন।
পিতৃপক্ষ ২০২৬ এবং মহালয়া ২০২৬ নিয়ে প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষে বাঙালি হিন্দু পরিবারগুলোয় একটা বিশেষ আবহ তৈরি হয় — পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এই পক্ষকাল তর্পণ, শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়, আর শেষ হয় মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠের সুরে, যা দুর্গাপূজার আগমনী বার্তাও বহন করে। এবছর ক্যালেন্ডারে একটা বিশেষ জটিলতাও আছে — জ্যৈষ্ঠ মাস মলমাস হওয়ায় তিথির হিসেবে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, যা নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে ২০২৬ সালের সঠিক তারিখ, তর্পণের নিয়ম এবং এই সময়ের খুঁটিনাটি এই পোস্টে আলোচনা করা হলো।
পিতৃপক্ষ ও মহালয়া কী এবং এর তাৎপর্য
পিতৃপক্ষ (মহালয়া পক্ষ নামেও পরিচিত) হলো ভাদ্র মাসের শুক্লা পূর্ণিমার পরবর্তী প্রতিপদ থেকে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা অমাবস্যা পর্যন্ত পক্ষকাল, যখন হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে পূর্বপুরুষদের আত্মা মর্ত্যে ফিরে আসেন এবং সন্তানদের কাছ থেকে জল, তিল ও অন্ন প্রত্যাশা করেন। এই সময় তর্পণ ও শ্রাদ্ধের মাধ্যমে পিতৃপুরুষদের তৃপ্ত করা হলে তাঁরা আশীর্বাদ দিয়ে পিতৃলোকে ফিরে যান বলে বিশ্বাস। শেষ দিনটি — সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা মহালয়া অমাবস্যা — সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই একটি দিনেই যে-কোনো পূর্বপুরুষের (তিথি অজানা থাকলেও) শ্রাদ্ধ করা যায়।
কেন এবার পিতৃপক্ষের তারিখ ভিন্নভাবে গণনা হচ্ছে — জ্যৈষ্ঠ মলমাসের প্রভাব
২০২৬ সালে জ্যৈষ্ঠ মাস মলমাস (অধিমাস) হওয়ার কারণে সৌর ও চান্দ্র মাসের মধ্যে একটা সমন্বয় ঘটেছে, যার ফলে ভাদ্র মাসের তিথিগুলো এবার আশ্বিন মাসের তারিখের মধ্যে এসে পড়েছে। এই কারণেই এবারের পূর্ণিমাকে পঞ্জিকায় "ভাদ্রী পূর্ণিমা" বলা হচ্ছে — অর্থাৎ তিথি হিসেবে এটি ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা হলেও, ক্যালেন্ডারের তারিখ অনুযায়ী তা আশ্বিন মাসের প্রথম দিকে পড়ছে। ভাদ্রী পূর্ণিমা সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পরেই প্রতিপদ তিথি থেকে পিতৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে গণনা শুরু হয় — পূর্ণিমার দিনটি নিজে পিতৃপক্ষের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তার পরের দিন থেকেই পক্ষকাল শুরু।
📖 মলমাস কী: চান্দ্র বছর সৌর বছরের চেয়ে প্রায় ১১ দিন ছোট হওয়ায়, প্রতি ২-৩ বছরে একটি অতিরিক্ত চান্দ্র মাস (অধিমাস বা মলমাস) যুক্ত করে দুই বছরকে সমন্বয় করা হয়। এই বছর সেই অতিরিক্ত মাসটি পড়েছে জ্যৈষ্ঠে, যার প্রভাবে পরবর্তী মাসগুলোর তিথি-ক্যালেন্ডার সম্পর্ক কিছুটা সরে গেছে।
পিতৃপক্ষ ২০২৬ কবে শুরু ও শেষ হচ্ছে?
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, ভাদ্রী পূর্ণিমা শেষ হচ্ছে শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর রাত্রে, আর তার পরের প্রতিপদ তিথি থেকে পিতৃপক্ষ শুরু হচ্ছে রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর (১০ আশ্বিন)। পিতৃপক্ষ শেষ হচ্ছে শনিবার, ১০ই অক্টোবর (ভাদ্রী কৃষ্ণা অমাবস্যা), যেদিন মহালয়া পালিত হবে।
📖 গুরুত্বপূর্ণ: চান্দ্র তিথির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় পিতৃপক্ষের তারিখ প্রতি বছর বদলায়, এবং মলমাসের বছরে সেই পরিবর্তন আরও লক্ষণীয় হয়। তাই প্রতি বছর নতুন করে তারিখ যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
মহালয়া ২০২৬-এর সঠিক তারিখ ও পঞ্জিকার তথ্য
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকায় ১০ই অক্টোবরের এন্ট্রিতে স্পষ্টভাবে লেখা আছে: "মহালয়া অমাবস্যা। মহালয়া পার্বণ শ্রাদ্ধম্, শ্রাদ্ধান্তরং ষোড়শ পিণ্ডদানম্। অপরপক্ষীয় শ্রাদ্ধ ও তর্পণ সমাপন।" অর্থাৎ এই দিনেই পিতৃপক্ষের সমস্ত শ্রাদ্ধ-তর্পণের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে এবং ষোড়শ পিণ্ডদান সম্পন্ন হয়। প্রথাগতভাবে অপরাহ্ণকাল (বেলা প্রায় ১টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে) তর্পণ ও শ্রাদ্ধের জন্য সবচেয়ে শুভ সময় বলে বিবেচিত হয়, যদিও অনেকে ভোরবেলাতেই গঙ্গা বা নদীতীরে তর্পণ সারেন।
আপনার শহরের অনুযায়ী সেদিনের সঠিক তিথি-সময় ও অপরাহ্ণকাল জানতে আমাদের দৈনিক পঞ্জিকা পাতা দেখে নিতে পারেন।
"যাঁদের তিথি জানা নেই, তাঁদের জন্যও মহালয়া অমাবস্যা একটাই দিন যথেষ্ট — এই একদিনেই সব ঋণ শোধ হয়।"
তর্পণ ও শ্রাদ্ধের নিয়ম — ধাপে ধাপে
১. প্রতিদিন প্রাতঃস্নানের পর পবিত্র বস্ত্রে পূর্বমুখী বা দক্ষিণমুখী হয়ে বসুন — পিতৃতর্পণে দক্ষিণমুখী হওয়াই বিধিসম্মত।
২. তামার পাত্রে জল, কালো তিল ও কুশ ঘাস নিয়ে অনামিকা ও বৃদ্ধাঙ্গুলির মাঝ দিয়ে (পিতৃতীর্থ দিয়ে) জল অর্পণ করুন।
৩. পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ এবং মাতা, মাতামহ, প্রমাতামহ — এই ছয় পুরুষের নাম স্মরণ করে পৃথক পৃথক অর্ঘ্য নিবেদন করুন।
৪. যে তিথিতে পূর্বপুরুষ প্রয়াত হয়েছিলেন, সেই তিথিতেই শ্রাদ্ধ করা হয়; তিথি অজানা থাকলে মহালয়া অমাবস্যার দিন করা হয়।
৫. কাক, কুকুর ও গরুকে খাদ্য নিবেদন করা হয় (কাক-বলি), কারণ এঁদের মাধ্যমে পিতৃপুরুষদের কাছে খাদ্য পৌঁছায় বলে বিশ্বাস।
৬. পিণ্ডদান — চালের গোলা (পিণ্ড) নিবেদন, যা পূর্বপুরুষদের তৃপ্তির প্রতীক এবং সাধারণত ব্রাহ্মণের সহায়তায় সম্পন্ন হয়।
৭. এই সময় নতুন কাজ শুরু, বিবাহ বা উৎসব-অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলাই রীতি, কারণ এটি শোক ও স্মরণের কাল।
জ্যোতিষশাস্ত্রে পিতৃদোষ ও এই সময়ের গুরুত্ব
বৈদিক জ্যোতিষে পিতৃদোষ বলতে বোঝায় জন্মকুণ্ডলীর নবম ভাব বা তার অধিপতির উপর শনি বা রাহুর অশুভ প্রভাব, যা অমীমাংসিত পিতৃঋণের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করা হয়। পিতৃপক্ষ ও বিশেষত মহালয়া অমাবস্যাকে বছরের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে গণ্য করা হয় এই দোষ প্রশমনের জন্য তর্পণ ও শ্রাদ্ধ করার। আপনার কুণ্ডলীতে নবম ভাব ও শনির অবস্থান ঠিক কেমন, তা জানতে চাইলে বিনামূল্যে অনলাইন জন্ম কুণ্ডলী তৈরি করে দেখে নিতে পারেন।
মহালয়ার সকাল ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
বাঙালির কাছে মহালয়ার ভোর মানেই আকাশবাণীর "মহিষাসুরমর্দিনী" অনুষ্ঠান — বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ ১৯৩০-এর দশক থেকে এই দিনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, আজও লক্ষ লক্ষ পরিবার ভোর চারটেয় উঠে এই সম্প্রচার শোনেন। একইসঙ্গে এই সময় থেকেই প্রতিমাশিল্পীরা দুর্গাপ্রতিমার চক্ষুদান শুরু করেন — এই আচারকেই দেবীর "জাগরণ" বলে গণ্য করা হয়। তাই মহালয়ার দিনটি একদিকে যেমন পিতৃপুরুষদের বিদায়ের দিন, তেমনই আরেকদিকে দেবীর আগমনী সূচনারও দিন — শোক ও উৎসব এই একটি ভোরেই মিলেমিশে যায়।
মহালয়ার পরদিন থেকেই দেবীপক্ষ ও দুর্গাপূজার সূচনা
পঞ্জিকা অনুসারে মহালয়ার ঠিক পরদিন, রবিবার ১১ই অক্টোবর, আশ্বিন শুক্লা প্রতিপদ থেকেই শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষ — এই দিনেই শ্রীশ্রীশারদীয়া দুর্গাদেবীর প্রতিপদাদি কল্পারম্ভ (দ্বিতীয় কল্প) ও নবরাত্রি ব্রতারম্ভ অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ পিতৃপুরুষদের বিদায়ের পরদিনই দেবীর আবাহন শুরু হয় — পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ও দেবীপক্ষের সূচনা একই সূত্রে বাঁধা।
পিতৃপক্ষের সময় পঞ্জিকার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দিন
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী এই সময়কালে বেশ কিছু কাকতালীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিন পড়ছে:
• ভাদ্রী পূর্ণিমার দিনই (২৬ সেপ্টেম্বর) পড়ছে অমরাত্মা পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিবস এবং লোকমাতা রাণী রাসমণির আবির্ভাব দিবস, পাশাপাশি যোগিরাজ শ্রীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের তিরোভাব দিবসও এই তিথিতেই।
• পিতৃপক্ষ শুরুর দিন (২৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব পর্যটন দিবস ও বিশ্ব শিশুকন্যা দিবসের সাথে মিলে যাচ্ছে।
• পিতৃপক্ষের মাঝামাঝি, ২রা অক্টোবর পড়ছে মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিবস (গান্ধী জয়ন্তী) — এই জাতীয় ছুটির দিনটিও এবার শ্রাদ্ধ-তর্পণের সময়কালের মধ্যে পড়ছে।
• মহালয়ার দিনটিতেই (১০ অক্টোবর) পালিত হয় জাতীয় ডাক দিবস।
"পিতৃপক্ষ শোকের কাল নয়, কৃতজ্ঞতার কাল — যাঁদের হাত ধরে আমরা এসেছি, তাঁদের স্মরণ করার সময়।"
❓ প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: পিতৃপক্ষ ২০২৬ কবে শুরু হচ্ছে?
উত্তর: ভাদ্রী পূর্ণিমা শেষ হওয়ার পর প্রতিপদ থেকে পিতৃপক্ষ শুরু হচ্ছে রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর (১০ আশ্বিন)। এবছর জ্যৈষ্ঠ মাস মলমাস হওয়ায় ভাদ্র মাসের তিথি আশ্বিনের তারিখে এসে পড়েছে।
প্রশ্ন ২: মহালয়া ২০২৬ কবে?
উত্তর: মহালয়া ২০২৬ পালিত হবে শনিবার, ১০ই অক্টোবর — এটি সর্বপিতৃ অমাবস্যা, যেদিন পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ঘটে।
প্রশ্ন ৩: ভাদ্রী পূর্ণিমা কী এবং এবার এটি নিয়ে বিভ্রান্তি কেন?
উত্তর: এবছর জ্যৈষ্ঠ মাস অধিমাস (মলমাস) হওয়ায় ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিটি ক্যালেন্ডারের আশ্বিন মাসের তারিখে পড়েছে, তাই একে ভাদ্রী পূর্ণিমা বলা হচ্ছে। এই পূর্ণিমা শেষ হওয়ার পরের দিন থেকেই পিতৃপক্ষ গণনা শুরু হয়, পূর্ণিমার দিনটি নিজে পিতৃপক্ষের অন্তর্ভুক্ত নয়।
প্রশ্ন ৪: কোন তিথি জানা না থাকলে শ্রাদ্ধ কবে করব?
উত্তর: পূর্বপুরুষের মৃত্যু তিথি অজানা থাকলে মহালয়া অমাবস্যার দিনেই (১০ অক্টোবর) শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করা যথাযথ, কারণ এই দিনে সকল পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করা যায়।
প্রশ্ন ৫: তর্পণের জন্য সবচেয়ে ভালো সময় কোনটি?
উত্তর: প্রথাগতভাবে অপরাহ্ণকাল (বেলা আনুমানিক ১টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে) সবচেয়ে শুভ, যদিও অনেকে ভোরবেলাতেও নদীতীরে তর্পণ সারেন।
প্রশ্ন ৬: পিতৃপক্ষে কী কী কাজ এড়িয়ে চলা উচিত?
উত্তর: এই সময় নতুন কাজ শুরু, বিবাহ বা যে-কোনো শুভ অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলাই রীতি, কারণ এটি পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও শ্রাদ্ধের সময় হিসেবে বিবেচিত।
প্রশ্ন ৭: মহালয়ার পর কী হয়?
উত্তর: মহালয়ার ঠিক পরদিন থেকেই দেবীপক্ষ শুরু হয় এবং নবরাত্রি ও দুর্গাপূজার প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে আরম্ভ হয়ে যায়।
হস্তরেখা বিচার₹১,০০১ থেকে
জন্মকুণ্ডলী₹১,৫০১ থেকে
বিবাহ মিলন₹২,০০১ থেকে
রত্নপাথরপরামর্শ
বাস্তু শাস্ত্রপরামর্শ
সংখ্যাতত্ত্বপরামর্শ
প্রশ্ন জ্যোতিষপরামর্শ
রাশিফলপ্রতিদিন বিনামূল্যে
পঞ্জিকাবাংলা তারিখ